ঋণের চেয়ে দান সাড়ে তিন গুণের বেশি
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচিত ৩০০ জন এমপির মধ্যে ১৪৭ জন নির্বাচনের খরচ মেটাতে আত্মীয়-অনাত্মীয়ের কাছ থেকে দান-ঋণ নেয়ার কথা বলেছিলেন।
আমানউল্লাহ আমানকে বাদ দিয়ে বাকিদের মধ্যে ৯২ জন এমপির ক্ষেত্রে এই অঙ্ক তাদের সম্ভাব্য নির্বাচনী ব্যয়ের অন্তত অর্ধেক। অর্থাৎ, ৩০০ এমপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশের (৩০.৭%) ঘোষিত নির্বাচনী ব্যয়ের অন্তত অর্ধেক অন্যের কাছ থেকে আসার কথা ছিল।
এই নির্ভরতার অর্থের ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাহ্যিক অর্থায়নের ঘোষণা দেওয়া ১৪৬ এমপির মোট ৳২৮.৪৬ কোটির মধ্যে ৳২২.২৪ কোটি (অর্থাৎ ৭৮.১%) ছিল দান। সম্ভাব্য দানের এই অঙ্ক ঋণের চেয়ে প্রায় ৩.৬ গুণ। সম্ভাব্য ঋণের পরিমাণ ছিল ৳৬.২২ কোটি (২১.৯%)।
দানের বড় অংশই (৳১২.৬০ কোটি) আবার আসার কথা আত্মীয়দের কাছ থেকে। অনাত্মীয়দের সম্ভাব্য দানের পরিমাণ ছিল ৳৯.৬৪ কোটি। অন্যদিকে আত্মীয়দের কাছ থেকে সম্ভাব্য ঋণ ছিল ৳৪.৯৬ কোটি এবং অনাত্মীয়দের ঋণ ৳১.২৬ কোটি।
সব বাহ্যিক অর্থায়নের ৭৮.১ শতাংশ ছিল দান এবং ২১.৯ শতাংশ ঋণ। শুধু দান বিবেচনা করলে আত্মীয়দের অংশ ৫৬.৭ শতাংশ, আর অনাত্মীয়দের অংশ ৪৩.৩ শতাংশ।
দানের বড় উৎস আত্মীয়
হলফনামায় সম্ভাব্য অর্থদাতাদের মধ্যে ভাই, স্ত্রী, বোন, সন্তান, বাবা-মা এবং অন্যান্য আত্মীয়ের উল্লেখ রয়েছে।
বিএনপি ও জামায়াত– দুই দলের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় অর্থ দানকারী আত্মীয়টি হওয়ার কথা 'ভাই'।
বিএনপির ৪৫ জন এমপি ভাইদের কাছ থেকে মোট ৳৪.৩৩ কোটি দান প্রত্যাশা করেছিলেন। জামায়াতের ৩৫ জন এমপি ভাইদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করেছিলেন মোট ৳২.২৪ কোটি।
নিচে সম্পর্কভিত্তিক চার্টে দান ও ঋণ একসঙ্গে দেখানো হয়েছে, যাতে প্রত্যেক ধরনের আত্মীয়ের মোট সম্ভাব্য অবদান বোঝা যায়।
আত্মীয়ের সম্পর্ক অনুযায়ী মোট কত টাকা দেয়ার কথা
ঘোষিত মোট অঙ্ক অনুযায়ী শীর্ষ ১০ আত্মীয়ের সম্পর্ক একসঙ্গে দেখানো হয়েছে।
আত্মীয়ের সম্পর্ক ও আত্মীয়ের আয়ের উৎস
ড্রপডাউন থেকে আত্মীয়ের ধরন নির্বাচন করলে সেই সম্পর্কের অর্থদাতাদের ঘোষিত প্রধান পেশা বা আয়ের উৎস এবং টাকার অঙ্ক দেখা যাবে।
বিএনপি-জামায়াত কোন আত্মীয়ের কাছ থেকে কত
ডিফল্ট ভিউতে ঘোষিত অঙ্ক অনুযায়ী শীর্ষ পাঁচ আত্মীয়ের ধরন দেখানো হয়েছে। ড্রপডাউন থেকে কোনো আত্মীয়ের ধরন নির্বাচন করলে সেটি প্রথম সারিতে দেখতে পাবেন।
সম্ভাব্য অর্থদাতা আত্মীয়দের বেশিরভাগই ব্যবসায়ী
হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এমপিদের নির্বাচনী প্রচারে সম্ভাব্য অর্থায়নকারী আত্মীয়দের বেশিরভাগই ব্যবসায়ী।
ব্যবসা থেকে আয়কারী আত্মীয়দের সম্ভাব্য অর্থের অঙ্ক ছিল ৳৭.৪৯ কোটি। চাকরিজীবী আত্মীয়দের ক্ষেত্রে অঙ্কটি ৳৪.১০ কোটি এবং প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে ৳০.৯৩ কোটি।
আত্মীয়দের আয়ের প্রধান উৎস : বিএনপি বনাম জামায়াত
সক্ষমতা সত্ত্বেও বাহ্যিক অর্থায়ন
হলফনামায় প্রার্থীরা নিজের আয়ের পাশাপাশি নিজের ও স্ত্রীর হাতে থাকা নগদ টাকা ও ব্যাঙ্কে জমা টাকার পরিমাণও উল্লেখ করেন।
১৪৬ জন এমপির ঘোষিত সম্ভাব্য মোট নির্বাচনী ব্যয় ছিল ৪৮ কোটি ৫২ লাখ ৪ হাজার ২শ টাকা। সব এমপি মিলিয়ে আয়কর নথিতে ঘোষিত আয় ছিল ১৯ কোটি ৩৪ লাখ ৪৬ হাজার ৩শ ৪৫ টাকা।
এমপিদের নিজের হাতে মোট নগদ ছিল ৫৬ কোটি ২৭ লাখ ৭৮ হাজার ৭শ ৫৭ টাকা। এমপিদের স্ত্রীদের হাতে নগদ ছিল ৫৭ কোটি ২৫ লাখ ৪১ হাজার ৯শ ৫৯ টাকা; এবং এমপিদের ব্যাংকে জমা ছিল মোট২৫ কোটি ৫৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫শ ২৩ টাকা।
এমপি প্রার্থীরা তাদের আয়কর নথিও জমা দিয়েছিলেন, এতে তাদের আয়ের অঙ্ক উল্লেখ করা হয়েছিল বাহ্যিক অর্থায়নের ঘোষণা দেয়া ১৪৬ এমপির মধ্যে ১২৭ জনের আয়কর নথিতে আয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।
১৪৬টি আসনের ঘোষিত মোট সম্ভাব্য ব্যয়, আয়কর নথির আয়, নিজের ও স্ত্রীর হাতে নগদ এবং ব্যাংকে জমা অর্থের সমষ্টিগত তুলনা।
কোনো এমপির ঘোষিত নিজের হাতে নগদ, স্ত্রীর হাতে নগদ ও ব্যাংকে জমা অর্থের যোগফল যদি তার সম্ভাব্য নির্বাচনী ব্যয়ের সমান বা বেশি হয়, তাহলে তাকে “হাতে থাকা অর্থে সক্ষম” হিসেবে ধরা হয়েছে।
এই অর্থের সাথে নির্বাচনী ব্যয়ের তুলনা থেকে দেখা যায় প্রার্থীদের অনেকে নিজস্ব অর্থেই সম্ভাব্য ব্যয় মেটাতে পারতেন। তবে তারাও আত্মীয় বা অনাত্মীয়ের কাছ থেকে ঋণ কিংবা দান পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
এরকম এমপিদের ঘোষিত তরল অর্থ, সম্ভাব্য নির্বাচনী ব্যয় ও বাহ্যিক অর্থায়নের চিত্র দেখুন নিচের চার্টে।
হাতে থাকা অর্থে সক্ষম এমপিদের তুলনা
পদ্ধতি পড়ুন
এই বিশ্লেষণটি সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামার ভিত্তিতে করা হয়েছে। সব হলফনামা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সরকারি ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। কেবল নির্বাচিত এমপিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; পরাজিত প্রার্থীদের বাদ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি হলফনামা থেকে প্রাসঙ্গিক তথ্য হাতে সংগ্রহ করে একটি কাঠামোবদ্ধ ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নিচের তথ্যগুলো আলাদা ঘরে রাখা হয়েছে: সম্ভাব্য নির্বাচনী প্রচার ব্যয়, নির্বাচনী প্রচারের সম্ভাব্য অর্থায়নের উৎস, আত্মীয়দের কাছ থেকে সম্ভাব্য ঋণ ও দান, অনাত্মীয়দের কাছ থেকে সম্ভাব্য ঋণ ও দান, অর্থদাতার সঙ্গে প্রার্থীর সম্পর্ক, অর্থদাতার ঘোষিত পেশা বা আয়ের উৎস, প্রার্থীর ঘোষিত বার্ষিক আয় এবং প্রার্থীর হাতে নগদ, স্ত্রীর হাতে নগদ এবং ব্যাংকে জমা অর্থ।
কোনো প্রার্থী একাধিক সম্ভাব্য অর্থদাতার নাম উল্লেখ করলে প্রত্যেক অর্থদাতাকে পৃথক রেকর্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পেশা ও আয়ের উৎসের শ্রেণি প্রমিতকরণ
একই ধরনের পেশা বা আয়ের উৎস বোঝাতে হলফনামায় ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তুলনার সুবিধার্থে সমার্থক বর্ণনাগুলো একীভূত করা হয়েছে।
| হলফনামায় যেভাবে লেখা হয়েছে | বিশ্লেষণে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে |
|---|---|
| প্রবাসী; বিদেশি আয় | প্রবাসী আয় |
| অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী; চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত; অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী | অবসরপ্রাপ্ত |
| অবসরকালীন কল্যাণ তহবিল; অবসর ভাতা; অবসরকালীন প্রাপ্ত অর্থ; পেনশন | অবসর ভাতা |
| আইন পেশা; আইন ব্যবসা; আইনজীবী | আইন পেশা |
| চিকিৎসক; চিকিৎসা পেশা | চিকিৎসা পেশা |
| ব্যক্তিগত সঞ্চয় | সঞ্চয় |
| লবণ ও চিংড়ি; লবণ ও চিংড়ি চাষ; লবণ ও ইটভাটা | ব্যবসা |
| শিক্ষক; শিক্ষকতা; বেতন ও ভাতা; ব্যাংক কর্মকর্তা | চাকরি |
| শিক্ষকতা ও কৃষি | চাকরি ও কৃষি |
| চাষাবাদ | কৃষি |
“চাকরি ও কৃষি”-র মতো একাধিক পেশা বা আয়ের উৎস একসঙ্গে উল্লেখ থাকলে যৌথ শ্রেণিটি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে এবং অর্থের অঙ্ক ভাগ করা হয়নি।
সম্পর্কের শ্রেণি প্রমিতকরণ
একই পারিবারিক সম্পর্কের ভিন্ন বর্ণনাগুলো এক শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। যেমন, সহোদর ভাই, ছোট ভাই, বড় ভাই ও ভাই–সবগুলোকে “ভাই” হিসেবে কোড করা হয়েছে। অন্য সম্পর্কের সমার্থক বর্ণনা ও বানানের ভিন্নতাও একইভাবে একীভূত করা হয়েছে।
ব্যক্তিভিত্তিক অঙ্ক উল্লেখ না থাকার সীমাবদ্ধতা
কিছু হলফনামায় একাধিক আত্মীয় বা অর্থদাতার নাম থাকলেও প্রত্যেকের কাছ থেকে সম্ভাব্য অর্থের অঙ্ক আলাদা করে উল্লেখ ছিল না। ফলে সম্পর্ক, পেশা বা আয়ের উৎসভিত্তিক অঙ্কের বিশ্লেষণে এসব রেকর্ড ব্যবহার করা যায়নি। তবে নির্ভরযোগ্য মোট অঙ্ক পাওয়া গেলে তা আসনভিত্তিক বাহ্যিক অর্থায়নের মোট হিসাবে রাখা হয়েছে।
| দল | এমপি | আসন |
|---|---|---|
| বিএনপি | এমরান আহমদ চৌধুরী | সিলেট-৬ |
| জামায়াতে ইসলামী | ওবায়দুল্লাহ সালাফী | নীলফামারী-৩ |
| বিএনপি | দীপেন দেওয়ান | রাঙামাটি |
| জামায়াতে ইসলামী | মোঃ আতাউর রহমান | নড়াইল-২ |
| জামায়াতে ইসলামী | সালাহ উদ্দিন | গাজীপুর-৪ |
আত্মীয়দের ঋণ বা দানের ব্যক্তিভিত্তিক অঙ্ক পাওয়া যায়নি
কিছু প্রার্থী আত্মীয়দের কাছ থেকে সম্ভাব্য মোট অর্থের অঙ্ক উল্লেখ করেছেন, কিন্তু কোন আত্মীয় কত টাকা দেবেন তা আলাদা করে জানাননি। তাই সম্পর্কভিত্তিক বিশ্লেষণে এসব অঙ্ক বণ্টন করা হয়নি।
| দল | এমপি | আসন | ঘোষিত মোট অঙ্ক |
|---|---|---|---|
| বিএনপি | মোঃ শওকতুল ইসলাম | মৌলভীবাজার-২ | ৳২২,০০,০০০ |
| বিএনপি | এস এ জিন্নাহ কবির | মানিকগঞ্জ-১ | ৳২৫,০০,০০০ |
| জামায়াতে ইসলামী | মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান | কুড়িগ্রাম-৪ | ৳৫,০০,০০০ |
| জামায়াতে ইসলামী | ওবায়দুল্লাহ সালাফী | নীলফামারী-৩ | ৳১০,০০,০০০ |
আর্থিক সূচক
প্রত্যাশিত বাহ্যিক অর্থায়ন
প্রত্যাশিত বাহ্যিক অর্থায়ন হিসাব করা হয়েছে এভাবে: আত্মীয়দের কাছ থেকে সম্ভাব্য ঋণ + আত্মীয়দের কাছ থেকে সম্ভাব্য দান + অনাত্মীয়দের কাছ থেকে সম্ভাব্য ঋণ + অনাত্মীয়দের কাছ থেকে সম্ভাব্য দান। এগুলো হলফনামায় ঘোষিত সম্ভাব্য উৎস; অর্থ বাস্তবে পাওয়া গেছে– তার প্রমাণ নয়।
হাতে থাকা অর্থ
এই বিশ্লেষণে “হাতে থাকা অর্থ” বলতে প্রার্থীর হাতে নগদ, স্ত্রীর হাতে নগদ এবং ব্যাংকে জমা অর্থের যোগফল বোঝানো হয়েছে। জমি, ভবন, ব্যবসায়িক সম্পদ, শেয়ার, যানবাহন ও অন্যান্য সম্পদ এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।
ঘোষিত হাতে থাকা অর্থ সম্ভাব্য নির্বাচনী ব্যয়ের সমান বা বেশি হলে কোনো এমপিকে হাতে থাকা অর্থে ব্যয় মেটাতে সক্ষম হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এটি কেবল ঘোষিত অর্থের ভিত্তিতে তৈরি বিশ্লেষণ; বাস্তবে ওই অর্থ ব্যবহারের প্রমাণ বা মোট সম্পদের পূর্ণাঙ্গ পরিমাপ নয়।
আসনভিত্তিক হিসাব
একই এমপির একাধিক ঋণ বা দানের রেকর্ড যোগ করে ওই আসনের মোট বাহ্যিক অর্থায়ন নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে একই আসন একাধিকবার গণনা না হয়।
অস্পষ্ট ও ব্যতিক্রমী তথ্য
কুষ্টিয়া-২ আসনের কিছু তথ্য হলফনামায় অস্পষ্ট থাকায় ব্যবহার করা যায়নি। আমানউল্লাহ আমানের (বিএনপি, ঢাকা-২) ঘোষিত ৳২৫ কোটি দান অন্য এমপিদের তুলনায় ব্যতিক্রমীভাবে বড় এবং সামগ্রিক ফলাফল ও চার্টের স্কেলকে অতিরিক্তভাবে প্রভাবিত করে। তাই সব হিসাব, শতাংশ, বর্ণনা ও ভিজ্যুয়ালাইজেশন থেকে তার তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষণের চূড়ান্ত পরিধি ১৪৬ জন এমপি।
